ছোটবেলায় একটা গল্প শুনেছিলাম, কার কাছে সেটা এখন মনে নেই, তবে গল্পটা এরকম - রামায়ণে সেতুবন্ধনের সময় রামচন্দ্রকে একটা কাঠবিড়ালী তার গায়ের মধ্যে করে বালি এনে দিয়ে সেতু বাঁধতে সাহায্য করেছিল। রামচন্দ্র আদর করে কাঠবিড়ালির পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়েছিল এবং সেই থেকেই তাই ওদের পিঠে অমন দাগ। সত্যি এটা গল্প হিসেবে খুবই কিউট একটা গল্প, কিন্তু বাস্তবটা আমার কাছে আরও কিউট। তাই এই গল্পটাকে আমার মনে এনে দিল।
আমার বাড়িতেও এমনই একটা ছোট্ট কাঠবিড়ালি আছে। আমাকে অনেক সাহায্য করে। তবে তাকে কাঠবিড়ালি না বলে এমনি বিড়াল বলাই ভালো কারণ আমি তাকে ম্যাও বলেই ডাকি। এই তো আজ রাতে তাকে ঘুম পারানোর আগে বিছানা ঝাড়ার সময় বললাম ম্যাও বিছানা থেকে চিরুনিটা তুলে নাও। বলা মাত্রই খুব ব্যাস্ত হয়ে চিরুনি তুলে ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার খুলে তাতে চিরুনি ভরে আবার বন্ধ করে দিল। তারপর বললাম সারা ঘরে জামা কাপড় ছরিয়ে আছে সোনা তুমি ওগুলো তুলে নিয়ে একটু লন্ড্রী ব্যাগে দিয়ে দাওনা। কথাটা শুনেই সংগে সংগে তার নিজস্ব ভংগিতে একটা একটা করে সেগুলো তুলে নিয়ে ব্যাগে রেখে এলো। ব্যাগটা একটু দূরেই রাখা আছে।
এরকম ছোট খাটো কাজ বা সাহায্য সারাদিনে সে এতো করে থাকে যে আমি একটা লেখায় তা ধরাতে পারবো বলে মনে হচ্ছেনা। (তবে বড়দের কাছে যেটা ছোট তার কাছে সেটা ছোট নয়। কারণ সে নিজেই এখন ভীষণ ছোট) আমার কাছাকাছি জলের বোতল না থাকলে সংগে সংগে আমি তো আবদারের গলায় শুরু করি বাবান একটু জল দাওনা। বাবান অমনি হ্যাঁচড় প্যাঁচড় করে এক লিটারের একটা জলের বোতল রান্নাঘর থেকে আমাকে এনে দিলো। তবে এনে দিয়েই সে কিন্তু ক্ষান্ত হয়না, নিজেও মনে মনে একটা গর্ব বোধ করে আর আমার আদরের লোভে গলাটা বাড়িয়ে দিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে, আদর করে দিলে লজ্জা পেয়ে হাসতে হাসতে চলে যায়।
সব সময় যে শুধু কাজ করে তা কিন্তু নয়। অকাজও করে। আমি হয়তো বললাম ম্যাও ওলেটা আয়নার পিছনে রেখে এসো। সে সেটা রেখে আরও পাঁচটা জিনিস সেখান থেকে বের করে ঘরের মেঝেতে ছড়ায়। তখন মনে হয় উফফ কেন আমি বললাম! আর নিজের খেলনা ছড়ানোর কথা তো লেখার দরকার আছে বলে মনে হয়না। খেলনাগুলো খেলনার ঝুড়িতে রেখে আসতে বললে ওই একই কাজ করে একটা রাখে আর দশটা....
আজকাল তার সব কথা শোনার পরেই ইমিডিয়েট নকল করা চাই সংগে দু একটা ছোট খাটো সেন্টেন্সেও। পা দিতে নেই। হাত ধুই। ভাত দি। ভাত দিচ্ছি। আইপ্যাড দি। তাই তাই তাই, মামার বাড়ি যাই। এই সমস্ত কথা সে বলে তবে সবই তার মিষ্টি মিষ্টি আধো উচ্চারণে।শুনতে খুব মজা লাগে। যদি বলি ঘুম পারিয়ে দাও। তখন আ আ করে গান করে থাবড়ে থাবড়ে আমাকে ঘুম পারাতে থাকে। কোনো গান শুনলে সেটার সুরটা করার চেষ্টা করে। গান শুনলে অবশ্য না নেচে থাকতে পারে না। বাজনা শুনলেও নাচ হয়ে যায়।
ম্যাও বয়সের দিক থেকে খুব ছোট্ট মাত্র এক বছর সাড়ে তিন মাসের, তা হলে কি হবে, তাকে আমার ছোট্ট ভাবতে ইচ্ছেই করে না। কারণ আমার সমস্ত কথা না হলেও অন্তত বেশিরভাগ কথাই যেন সে বুঝতে পারে। সে আমার সংগে ফাজলামিটাও করে যেন বুঝে বুঝে। একেবারেই কানাই মাস্টারের বিড়াল ছানা '... আড়ে আড়ে চায় মুখপানে, এমনি সে ভান করে যেন যা বলি বুঝেছে তার মানে।' সত্যি আমার ছানা বিড়ালটাও সেদিক থেকে যেন কোনো অংশে কম যায় না। সে ছোট্ট ছেলে নয়। ছোট্ট একটা মানুষ। তাই তার সংগে সারাদিন আমি খেলা করে, গল্প করে, আনন্দ করে অনায়াসে কাটিয়ে দিতে পারছি। সেও আমাকে আনন্দ দিতে পারে শুধু খেয়ে, ঘুমিয়ে আর কেঁদে দিন কাটিয়ে দেয় না। সে রীতিমতো বাড়ির একজন এনটিটি। আমার ছোট্ট ম্যাও। সোনা তোমাকে এত্তো আদর আর চুমু উমমাহ!!
No comments:
Post a Comment