Wednesday, October 22, 2014

ব্ল্যাকমেলিং :)

বাবান এখন প্রায় প্রত্যেক কথাতেই আমাকে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল করে। পান থেকে চুন খসার এতোটুকু উপায় নেই। কোনোনা কোনো ছুতোয় রাগ করাটা তার একটা কাজের মধ্যে পড়ে। আমাকে হয়তো বললো মা আইপ্যাডটা দাও। আমি যদি বলি না এখন হবেনা। সঙ্গে সঙ্গে বড়ো একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলে - যাহ! বলে মুখ ব্যাজার করে বসে থাকে। তারপরেই বলে - তুমি তাহলে আমাকে একটুও ভালোবাসবে না। তুমি বাবাকে ভালোবাসবে। সদ্য সদ্য মামাবাড়ি থেকে ফিরেছে, তাই এখন বলে - আমাকে মামা ভালোবাসবে, মামণি ভালোবাসবে, অঙ্কিতদাদা ভালোবাসবে। তুমি বাড়ি থেকে চলে যাও। আমি একাই থাকবো। তুমি পড়তে চলে যাও, তুমি দরজা দিয়ে বাইরে চলে যাও, আমাকে একদম ভালোবাসবে না।

মুখে এসব কথা, মনে প্রত্যাশাটা অবশ্যই উল্টো। এক ছুটে গিয়ে বিছানায় উঠে সে হয় বালিশে নয় চাদরে মুখ ঢেকে শুয়ে থাকে। তাকে জোর করে আদর করতে হয়। সে আরো কিছুটা রাগ দেখায় - না যাও, যাও। সরিয়ে দেয়। তখন আরো জোর করে ধরে আদর করে দিতে হয়। তখন গল্প শেষ হয়। কখনো কখনো তার রাগকে গুরুত্ব না দিয়ে "আমাকে ভালবাসবে না" আদেশটা যদি আমরা তখনকার মতো মেনে নিই, তাহলে সে মুখ ঢেকে চুপ করে অপেক্ষা করে। একবার আমরা বুঝতে পারিনি যে ও অন্য ঘরে গিয়ে রাগ করে শুয়ে আছে। কিছুক্ষণ পরে সে গট গট করে আমরা যে ঘরে ছিলাম সেই ঘরের দরজায় এসে দাঁড়িয়ে দেখা দিল। ফোলানো ঠোঁট অভিমানে থরথর করে কাঁপছে। এক মূহুর্ত দেখা দিয়েই আবার আরো রাগ করে গিয়ে শুয়ে পড়লো। অভিমান দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছিলো ততক্ষণে! 

কাল বিকেলে টিভিতে  হিং টিং ছট অনুষ্ঠানে "পাকুড় জলার পেত্নী" বলে একটা গল্প দেখছিলো। সেখানে পেত্নীকে দেখেই ভয় পেয়ে ওর চেয়ার থেকে আমার চেয়ারে, আমার কোলে চলে এলো। বললাম আমার কষ্ট হচ্ছে তুমি তোমার চেয়ারে বোসো। কিছুতেই যেতে চাইছেনা। আমি তো জানি ভয়ে যাচ্ছে না। তাই আমিও মজা করে জোর দিচ্ছিলাম, তোমার চেয়ারে যাও। সঙ্গে সঙ্গে বললো তাহলে কিন্তু পেম্নী আমাকে হামি করবে। পেত্নীকে পেম্নী বলে। তুমি হামি দিতে পারবে না!! এরকম নানান ইমোশনাল ব্ল্যাকমেলিং আমার সঙ্গে চলতে থাকে। 

প্রয়োজন মতো রিকোয়েস্ট করতেও শিখেছে। সকালে বাবা অফিস বেরোনোর আগে তার কাছে গিয়ে শুরু করে -  বাবাআহ!  প্লিজ আমাকে চান করিয়ে দাওহ! রাতে বলে বাবা প্লিজ ব্রাশ করিয়ে দাওহ, আমার ঘুম পেয়েছে। খুব সুন্দর একটা সুর আছে তার রিকোয়েস্ট করার। চুইনগাম খাওয়ানোর ইচ্ছে হলে মা প্লিজ, বাবা প্লিজ একটা খাও। আমি ছোটো আমার কথাটা শোনো, প্লিজ! খাওহ!! আবার না খেলেই সঙ্গে সঙ্গে গলার স্বর চরমে তুলে - আই খাও বলছি, শুনতে পাচ্ছোনা? বলেই একটা হাতের উল্টোদিকের চড় কষিয়ে দেয়।

তবে বাবান খুব শিগগির বড় হয়ে যাচ্ছে আমরা বুঝতে পারছিনা। তার কিছু কথা সেটা মনে করিয়ে দেয়। পরশুদিন বাবান তার একটা ছোটো খেলনা-বালতি খুঁজছিলো। পেলোনা যখন আমাকে বললো খুঁজে দাও। আমি বললাম ওইখানে দ্যাখোনা। মনে হয় মিতামাসি কাজ করার সময় গুছিয়ে রেখে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে করুণ মুখ করে বললো - না, মনে হয় মিতামাসি চুরি করে নিয়ে চলে গেছে। বললাম ছি! ছি! একথা একদম বোলোনা। অমন বলতে নেই। সে তোমার সব খেলনা যত্ন করে গুছিয়ে রেখে যায়। সত্যি এটা খুবই ডেঞ্জারাস কথা। আমরা সাধারণতঃ এইধরনের কথা বলিনা, কিন্তু কিছুদিন আগে এমন একটা প্রসঙ্গ উঠেছিল বাড়িতে, নিশ্চয়ই তখন শুনে রেখেছে। ওর বাবা শুনে বললো সাবধান বাবান কিন্তু বড় হয়ে গেছে।

সত্যিই তাই। বাবান বড়ো হয়ে গেছে। এখন সে নিজের থেকে গুছিয়ে সেন্টেন্স বলে। কোনো কথা শুনে বললে, প্রয়োজনমতো তার সঙ্গে এক্সট্রা কথা জুড়ে দিয়ে কথা কমপ্লিট করে। নিজের থেকে বানিয়ে গল্প বলে। ফলে এখন আমাদের খুব সাবধানেই বাক্যবিনিময় করতে হয়। আমরাও প্রয়োজনমতো 'বাক্যবিনিময়ে'র মতো তার অজানা কিছু শব্দ ব্যবহার করে কথা বলি। কোনো একটা সূত্র খুঁজে পেলেই বলে ওঠে কার কথা বলছো? আমার কথা? ও হ্যাঁ বুঝেছি আমার কথা। বলেই লজ্জা পেয়ে মুচকি মুচকি হাসে। এই লজ্জা লজ্জা হাসিটা সে কোনো কিছুতে ধরা পড়ে গেলেও হাসে।

চালাকিতেও সে কোনো অংশে কম যায়না। তার জল খেতে একটু অনিহা আছে। তাই নানান ছুতোয় আমি জল খাওয়াই। কাল আমি একগ্লাস জল দিয়ে বললাম - বনু কিভাবে জল খায় দেখাও। বনু ওর মামার মেয়ে। অঙ্কিতদাদা কিভাবে খায় দেখাও। দুবারই দেখালো।  তারপর বললাম বাবুরামমামা কিভাবে খায়? বনুর মামা। ঝপাৎ করে বালিশে শুয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ফিচফিচ করে হাসতে হাসতে বললো - এবার তুমি দেখাও!! সে মুখটা বেশ লক্ষ করার মতো।

সারাদিন নানান ফাজলামি, দুষ্টুমি, খেলা, বকবক করে পুরো জমিয়ে রাখে। তার সঙ্গে যে থাকে তাকে একটুও বোর হতে দেয়না। সারাদিন নানান কাজে নিজেও ব্যস্ত থাকে, সবাইকে রাখেও। নিজের চাহিদাগুলো পরিষ্কার বলতে পারে, বুঝিয়ে দিতে পারে। খুবই মজার, দুষ্টু, ফাজিল আমার সোনাসোনা বুড়ো। এত্তো আদর। উমমমাহহ!!

No comments:

Post a Comment